মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক দাবায় নতুন চাল: পাকিস্তানের উত্থান, ভারতের নীরব কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক দাবায় নতুন চাল: পাকিস্তানের উত্থান, ভারতের নীরব কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংঘাত শুরুর পর ইসলামাবাদ দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। এমনকি একটি বহুপয়েন্টের শান্তি প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আলোচনার জন্য প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার প্রস্তাবও দেয়। যদিও তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে, তবুও পাকিস্তানের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি ভারতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের এই দৃশ্যমান ভূমিকা দিল্লির জন্য কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে এ নিয়ে ভিন্নমত স্পষ্ট—একটি অংশ মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক বিবেচনায় দিল্লির আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল, যাতে বৈশ্বিক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে তাদের অনুপস্থিতি চোখে না পড়ে। অন্যদিকে আরেকটি মত বলছে, বিনা আমন্ত্রণে বা স্পষ্ট স্বার্থ ছাড়া এমন জটিল সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

          প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের এই ভূমিকা তুচ্ছ করে ‘দালালি’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৮১ সাল থেকেই ইসলামাবাদ এ ধরনের ভূমিকায় যুক্ত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র–তালেবান আলোচনার সময়ও তারা একই ধরনের মধ্যস্থতামূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল।


বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতামূলক তৎপরতা মূলত প্রতীকী এবং স্বল্পমেয়াদি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পারস্পরিক অবিশ্বাস এত গভীর যে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দ্রুত কোনো সমাধান আসার সম্ভাবনা সীমিত। ফলে ইসলামাবাদের ভূমিকা বাস্তব ফলাফলের চেয়ে বেশি কূটনৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের দিকেই কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে এটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


ভারতের জন্য মূল প্রশ্নটি তাই ‘মধ্যস্থতাকারী হওয়া উচিত ছিল কি না’—এখানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৃহত্তর কৌশলগত অবস্থান কী হওয়া উচিত, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের শক্তি হলো তার বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ। তবে একই সঙ্গে এটি এমন একটি দেশ নয়, যাকে বড় শক্তিগুলো সহজে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ব্যবহার করতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দিল্লির উচিত সরাসরি আলোচনার টেবিলে আসার চেয়ে পরোক্ষভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি করা—যেমন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য পথ এবং সামুদ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।


এছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরেও এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। বিরোধী মহল সরকারের ‘নীরব’ বা ‘সংযত’ অবস্থানকে সমালোচনা করছে, যেখানে তারা মনে করছে ভারত আরও স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দিতে পারত। অন্যদিকে সরকারপক্ষের অবস্থান হলো, অতিরিক্ত দৃশ্যমানতা বা প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতি সব সময় কার্যকর হয় না; বরং হিসাবকৃত নীরবতা অনেক সময় বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।


সব মিলিয়ে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে—পাকিস্তান দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে, আর ভারত তুলনামূলকভাবে সংযত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিকে ঝুঁকছে। ভবিষ্যতে কোন পন্থা বেশি কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কেবল তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সাফল্যের ওপর নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাস্তব স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে তার ওপর।



সূত্র: বিবিসি


Leave a Reply

Cancel Reply

Your email address will not be published.

Follow US

VOTE FOR CHAMPION

Top Categories

Recent Comment

  • user by Anonymous

    Good luck Atoz news

    quoto
  • user by আব্দুল আলীম সরকার

    আপনাদের খবরগুলো ভালো

    quoto

Please Accept Cookies for Better Performance