ইরান যুদ্ধের চাপ সামলে কূটনৈতিক সাফল্যের খোঁজে কি বেইজিংমুখী ট্রাম্প?

ইরান যুদ্ধের চাপ সামলে কূটনৈতিক সাফল্যের খোঁজে কি বেইজিংমুখী ট্রাম্প?

ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে চাপের মুখে থাকা ট্রাম্প কি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের নতুন পথ খুঁজতে চীন সফরে যাচ্ছেন!!



এক বছর আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ব্যাপক বাণিজ্য শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে চাপে ফেলতে পারবেন। তবে আদালতের বাধা ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেই কৌশল পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চীনকে নতজানু করার বদলে বরং বেইজিংয়ের সহযোগিতাই চাইছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর আগের কঠোর অবস্থান এখন সীমিত হয়ে এসেছে সয়াবিন, গরুর মাংস ও বোয়িং উড়োজাহাজ বিক্রিসংক্রান্ত কিছু বাণিজ্যচুক্তিতে। একই সঙ্গে ইরান সংকট মোকাবিলায়ও চীনের সহায়তা প্রত্যাশা করছেন তিনি।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলেজান্দ্রো রেয়েস মনে করেন, "বর্তমান বাস্তবতায় চীনের চেয়ে ট্রাম্পেরই বেইজিংকে বেশি প্রয়োজন।" তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প এখন এমন একটি কূটনৈতিক সাফল্য খুঁজছেন, যা দেখাতে পারবে তিনি শুধু বৈশ্বিক অস্থিরতা তৈরি করেন না, বরং স্থিতিশীলতাও প্রতিষ্ঠা করতে চান।

দুই নেতার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে। সে সময় ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক স্থগিত করেছিলেন এবং পাল্টা হিসেবে সি চিন পিং বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার হুমকি থেকে সরে এসেছিলেন।


এরপর থেকেই চীন নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল জোরদার করে। অন্যদিকে ট্রাম্প ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে আদালতের রায় মোকাবিলা এবং ইরান যুদ্ধ সামলাতে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে তাঁর জনপ্রিয়তাও চাপে পড়ে, বিশেষ করে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।

আসন্ন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে বেইজিংয়ে। দুই নেতা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেবেন, ইউনেসকোর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করবেন এবং রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগ দেবেন। পাশাপাশি তাঁদের মধ্যে চা–আড্ডা ও মধ্যাহ্নভোজেরও আয়োজন রাখা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফর থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আসার সম্ভাবনা কম। মূলত সীমিত কিছু বাণিজ্যচুক্তি ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনাই হতে পারে। দুই দেশের চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে যে সাময়িক বিরতি রয়েছে, তার মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে কি না, সেটিও এখনো অনিশ্চিত।

এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে থাকবেন ইলন মাস্ক এবং অ্যাপলের প্রধান টিম কুক–সহ কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী। পাশাপাশি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি, হংকংয়ের কারাবন্দী গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাই–এর বিষয় এবং চীনে আটক মার্কিন নাগরিকদের প্রসঙ্গও আলোচনায় তুলতে পারেন ট্রাম্প।



একের পর এক আন্তর্জাতিক সংকটে ট্রাম্প

২০২৫ সালের এপ্রিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর আরোপিত উচ্চ শুল্ক চীনকে স্পষ্ট বার্তা দেবে যে “যুক্তরাষ্ট্রকে আর শোষণ করা যাবে না।” তবে ওয়াশিংটনের এই চাপের পাল্টা জবাব দেয় বেইজিং। চীন বিরল খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করলে পশ্চিমা বিশ্বের বড় একটি দুর্বলতা সামনে আসে। কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ খাত এসব খনিজের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এই অর্থনৈতিক পাল্টাপাল্টি চাপের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সমঝোতার আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক আন্তর্জাতিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে। ভেনেজুয়েলা ইস্যু, ন্যাটো সদস্য গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার বিতর্কিত প্রস্তাব এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান—সব মিলিয়ে হোয়াইট হাউসের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে।

বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলে। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এখন চাইছেন, চীন যেন ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে উৎসাহিত করে। কারণ চীন ইরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং দেশটির তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন উপ–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন ম্যাট পটিংগার। তাঁর মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।


তাইওয়ান ইস্যুতে বাড়তে পারে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য কোনো সমঝোতার বিনিময়ে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে আরও কৌশলগত সুবিধা চাইতে পারে। স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটিকে বেইজিং নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে।

এ কারণে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়, তবে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়াতে চীন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে। এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতে এশিয়ার অন্যান্য দেশও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারে, কারণ তারা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেই বড় ভরসা হিসেবে দেখে।

সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি-পরামর্শ বোর্ডের সদস্য উ জিনবো বলেন, ট্রাম্পের উচিত স্পষ্টভাবে জানানো যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করবে না এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডাকেও উৎসাহ দেবে না।


সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখাই এখন বড় লক্ষ্য

চীন চাইছে, ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসন যেন নতুন করে প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা পাল্টা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে। একই সঙ্গে উন্নত চিপ ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবিও জানিয়েছে বেইজিং।

গত অক্টোবরের পর থেকে চীন নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো যাতে উৎপাদন ও সরবরাহশৃঙ্খল অন্য দেশে সরিয়ে নিতে না পারে, সে জন্য নতুন আইনও চালু করেছে দেশটি। পাশাপাশি বিরল খনিজ রপ্তানির লাইসেন্স নীতিও আরও কঠোর করা হয়েছে।

শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ।


             সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, দুই দেশের সম্পর্ক যদি আপাতত স্থিতিশীল রাখা যায় এবং চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতি আরও কিছু সময় বাড়ানো সম্ভব হয়, তবে ট্রাম্প সেটিকেই নিজের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবেন।


সূত্র: রয়টার্স


Leave a Reply

Cancel Reply

Your email address will not be published.

Follow US

VOTE FOR CHAMPION

Top Categories

Recent Comment

  • user by Anonymous

    Good luck Atoz news

    quoto
  • user by আব্দুল আলীম সরকার

    আপনাদের খবরগুলো ভালো

    quoto

Please Accept Cookies for Better Performance