ইরান কি ট্রাম্পের কৌশলগত ফাঁদে পা দিল?

ইরান কি ট্রাম্পের কৌশলগত ফাঁদে পা দিল?

স্বল্প সময়ের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ওমান উপকূলঘেঁষা একটি দক্ষিণ করিডোর ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে—এমন অভিযোগ এনে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস বহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজে আবারও হামলা শুরু করেছে তেহরান। পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নৌ সক্ষমতার ওপর হামলা চালিয়েছে।


ছবি: সংগৃহীত ( ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনি)


বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা আবারও জোরালো হয়েছে।


ইরানের কৌশল—সুবিধার চেয়ে ক্ষতিই বেশি?

তুরস্কের আঙ্কারাভিত্তিক সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজ-এর গবেষক ওরাল তোগার মতে, বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে ইরান একটি বড় কৌশলগত ভুল করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সংঘাতে ইরানের নৌ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিও আগের তুলনায় দুর্বল। ফলে হরমুজ প্রণালি ছিল তেহরানের হাতে থাকা শেষ কার্যকর চাপ প্রয়োগের মাধ্যম। কিন্তু এর কার্যকারিতা কমে আসার সময়ই সেটি ব্যবহার করায় কৌশলগত সুবিধার বদলে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।

তিনি জানান, জুনের শেষ দিকে ওমান উপকূলের বিকল্প নিরাপদ নৌপথ ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন হামলাগুলো সেই অবস্থান পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হলেও, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও ক্রমশ ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

সামরিক চাপ বাড়ছে

ইতালির ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ ইসলামি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সামরিক চাপ আরও বাড়ছে। কারণ প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের অবস্থান প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত তা শনাক্ত ও ধ্বংস করার সুযোগ দিচ্ছে।

তবে তার মতে, ইরানের সামরিক কৌশলে একটি বিষয় স্পষ্ট—শত্রুপক্ষ অবস্থান শনাক্ত করার আগেই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা। ইসলামির ধারণা, এই সংঘাতের চূড়ান্ত ফল যুদ্ধক্ষেত্রেই নির্ধারিত হবে এবং স্পষ্ট বিজয়ী ও পরাজিত নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা কম।


কূটনৈতিক সমাধানের পথ কতটা খোলা?

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনও থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত।

ওরাল তোগা জানান, জুলাইয়ের শুরুতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি, জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং যৌথ যোগাযোগব্যবস্থা চালুর বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। যদিও যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে, তবুও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তার মতে, সীমিত সমঝোতার মাধ্যমে ইরান কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা ও কূটনৈতিক স্বস্তি পেতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করে নিজেদের কৌশলগত সাফল্য দাবি করতে পারবে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির পরিবর্তে উত্তেজনা কমানোর একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হতে পারে।

অন্যদিকে মোহাম্মদ ইসলামি মনে করেন, যুদ্ধ চললেও পরোক্ষ কূটনীতি অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষায়, "আলোচনা যুদ্ধেরই একটি অংশ।" তবে ইরান যদি জ্বালানি বাজারে নিজেদের প্রভাব প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে আগ্রহী হবে না।


ট্রাম্পের কৌশলগত সুবিধা?

ওরাল তোগার মূল্যায়নে, যুদ্ধবিরতির পথ ছেড়ে সংঘাত বাড়িয়ে ইরান কার্যত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশলগত পরিকল্পনার সুবিধাই বাড়িয়ে দিয়েছে। তার মতে, প্রতিটি ট্যাঙ্কারে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্রমাগত দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে আলোচনা চললেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।

অবশ্য এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। যুদ্ধ পরিচালনায় ইতোমধ্যে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে।

তোগার মতে, তেহরানের প্রত্যাশা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ও রাজনৈতিক চাপ ইরানের ক্ষতির তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কৌশলগত ভারসাম্য এখনো ওয়াশিংটনের পক্ষেই রয়েছে।


অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও জনমত

মোহাম্মদ ইসলামি বলেন, জুলাইয়ের শুরুতে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির জানাজায় বিপুল জনসমাগম যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মূল্যায়নে পরিবর্তন এনেছে। আগে তাদের ধারণা ছিল ইরানি সরকারের জনসমর্থন দুর্বল এবং জনগণ সরকারের নীতির বিরোধী। কিন্তু সাম্প্রতিক জনসমাগম সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

অন্যদিকে ওরাল তোগা এই সমাবেশকে জাতীয়তাবাদী আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলেও এটিকে রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে মানসিক প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।

তার মতে, যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং ব্যাপক জনঅসন্তোষের মুখে ছিল। যুদ্ধ সাময়িকভাবে সেই অসন্তোষকে আড়াল করলেও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করেছে। ভবিষ্যতে জনসেবার মান আরও অবনতির দিকে গেলে জাতীয়তাবাদী ঐক্যের জায়গায় সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

Leave a Reply

Cancel Reply

Your email address will not be published.

Follow US

VOTE FOR CHAMPION

Top Categories

Recent Comment

  • user by Anonymous

    Good luck Atoz news

    quoto
  • user by আব্দুল আলীম সরকার

    আপনাদের খবরগুলো ভালো

    quoto

Please Accept Cookies for Better Performance