জাপানে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প: বিস্ফোরণে নিহতের আশঙ্কা, বিদ্যুৎহীন হাজারো পরিবার
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুমামতো প্রিফেকচারে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। ভূমিকম্পের পর একটি বড় শপিং মলে বিস্ফোরণের ঘটনায় কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার বিকেলে আঘাত হানা এ ভূমিকম্পে হাজার হাজার বাড়ি বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বেশ কয়েকটি ভবনে ফাটল ও ধসের ঘটনাও ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী আফটারশকের আশঙ্কায় জনগণকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

কুমামোটো প্রিফেকচারের ইয়াতসুশিরোতে ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত কিউশু এক্সপ্রেসওয়ের একটি আকাশচিত্র [কিয়োডো, রয়টার্সের মাধ্যমে]
শপিং মলে বিস্ফোরণ, নিখোঁজ বহু শ্রমিক
সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে (NHK) জানায়, ভূমিকম্পের পর কুমামতোর বৃহত্তম শপিং মলগুলোর একটি এওন (AEON) মলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের সময় সেখানে কর্মরত প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণে কয়েকজন নিহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দল অভিযান চালাচ্ছে।
আহত শতাধিক, ট্রেন লাইনচ্যুত
স্থানীয় হাসপাতালগুলোর বরাতে এনএইচকে জানিয়েছে, একটি হাসপাতালে ৫০ জনের বেশি আহতকে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য একটি হাসপাতালে আরও প্রায় ৪০ জন আহত চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা গুরুতর।
এদিকে, ভূমিকম্পের কম্পনে একটি দ্রুতগতির শিনকানসেন ট্রেন আংশিক লাইনচ্যুত হওয়ায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার
ভূমিকম্পের পরপরই উপকূলীয় এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রের আশপাশে থাকা তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়নি।
জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক বিবৃতিতে বলেন, ইতোমধ্যে আহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক ও সেতুর ক্ষয়ক্ষতি এবং ভবন ধসের খবর পাওয়া গেছে।
তিনি নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবাইকে সম্ভাব্য আফটারশকের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "একই মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।"
তিন লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় তিন লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য শত শত আত্মরক্ষা বাহিনীর (Self-Defense Forces) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিমান ও রেল চলাচলে বিঘ্ন
নিরাপত্তাজনিত কারণে কিউশু অঞ্চলে শিনকানসেন বুলেট ট্রেনসহ স্থানীয় ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এছাড়া আসো-কুমামতো বিমানবন্দরের রানওয়েও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে না।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
ভূমিকম্পের সময় কুমামতো শহরের একটি পাবে অবস্থান করছিলেন কাজুয়া সুরুনাগা। তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টিবিএস-কে বলেন,
"হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। এরপর বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখি। বাতাসে ধোঁয়া ও ধুলোর কারণে পুরো এলাকা আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে ঢেকে যাওয়ার মতো মনে হচ্ছিল।"
এওন মলের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভূমিকম্পের পরপরই ক্রেতা ও কর্মচারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী বিস্ফোরণের কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শিল্পকারখানার কার্যক্রমে প্রভাব
ভূমিকম্পে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা টিএসএমসি (TSMC), সনি (Sony) এবং ফুজিফিল্ম (Fujifilm)-এর কুমামতো অঞ্চলের কারখানাগুলোও প্রভাবিত হয়েছে।
টিএসএমসি জানিয়েছে, তাদের সব কর্মী নিরাপদ রয়েছেন এবং কারখানার কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, সনি ও ফুজিফিল্ম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কারখানা থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে।
বিদ্যুৎহীন ৪৮ হাজার পরিবার
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিউশু ইলেকট্রিক পাওয়ার জানিয়েছে, ভূমিকম্পের ফলে প্রায় ৪৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ জাপান
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি জাপান। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার' অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্বে সংঘটিত ৬ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ২০ শতাংশ ভূমিকম্প জাপানেই ঘটে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে কুমামতোতে সংঘটিত দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ২৭৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৭৩৯ জন আহত হয়েছিলেন। মঙ্গলবারের ভূমিকম্পে তখন থেকে সংস্কারাধীন ঐতিহাসিক কুমামতো দুর্গের পাথরের দেয়ালের কিছু অংশও আবার ধসে পড়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
